ভেঙে যাওয়া পরিবারের সন্তানেরা -রক্তের সম্পর্ক

ভেঙে যাওয়া পরিবারের সন্তানেরা -রক্তের সম্পর্ক

জীবনযাপন

আমার মা-বাবার ডিভোর্স হয়ে গেছে-সম্পর্ক

আমার মা-বাবার ডিভোর্স হয়ে গেছে| আমি আমার মার সাথে ঢাকায় থাকি, আর আমার বাবা থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে | আমার বাবা যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরেই অন্য মহিলাকে বিয়ে করেন | বিয়ে করার কারণ হিসেবে তুলে ধরেন তার একাকিত্ব কে| আমার বাবা যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সময় মাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলে যায়, যত দ্রুত সম্ভব কাগজ ঠিক করে আমাদের নিয়ে যাবেন| বাবা দেশে এসেছিলো তবে আমাদের নিতে নয়, বাবা এসেছিলো মাকে ডিভোর্স দিতে |আমার মা একটা স্কুলে চাকরি করে মুটামুটি বেতন | আমার মা খুবই আত্ম-সম্মান বোধ সম্পন্ন একজন মানুষ |মা-বাবার ডিভোর্সের বিষয় টা বেশির ভাগ মানুষ জানতে পারে আমার নানু বারির লোকজনের কাছে থেকে |মা এই বিষয় নিয়ে কারো সাথে কথা বলে নাই | একদিন আমার নানু ও মামা আমাদের বাসায় আসে, আর আমার মার সাথে অনেক রাগারাগি করে|আমার মামা আমার মাকে বলে রফিকের এই সিদ্ধান্ত আমাদের কেন জানাস নাই? আমাদের জানালে রফিক কোনোভাবেই পারতো না তোকে ডিভোর্স দিতে |কত বড় সাহস! একটা মেয়ে আছে সংসার আছে, আর সে কিনা কোন এক মহিলার পাল্লায় পড়ে,তোকে ছেড়ে দেয়! ওকে ভালো করে বুঝাতাম আর ভালো কথায় না বুঝলে,এমন ব্যবস্হা করতাম দেশ থেকে বের হতে পারতো না|

আর তোর শাশুড়ী কি বলে, তার এতো গুণের ছেলের বিষয়?

এই সব কথার মাঝখানে মা মামাকে থামিয়ে দেয়,আর নানু কে এক কথায় বলে দেয়, মা তোমাদের’কে রফিকের কথা বলে কোনো লাভ হতো না,তোমরা কেউ কিছুই করতে পারতে না, কারণ রফিক অন্য একজনকে ওর জীবনের গল্প সাথে জড়িয়ে ফেলেছে |আর সেখানে আমি কেনো জোর করে ওর সাথে থাকবো?আমি কি ওর করুণার পাএ হয়ে, ওর সাথে থাকবো?আর সে এখন আমার সাথে থাকতে চায় না, তখন তার সাথে থাকতে চাওয়ার মতো অপমানের লজ্জার আর কি হতে পারে? আর আমি অথর্ব, কেউ না, আমি আমার জীবনে একা চলতে পারবো | তখন নানু মাকে আরো অনেক বেশি করে বকা দিয়ে চলে যায়| আর নানু যাওয়ার সময় মাকে বলে যায় তোর এতো বুঝ বলেই তোরো জীবন টা এমন হলো, কারো কথার কোনো মূল্য নেই তোর কাছে | আমার নানুর বাসায় সবাই মাকে একটু সামলে চলে |কারণ আমার মা খুবই রাগি আর নিজের মতো করে চলে|

আমার দাদি খুবই দুঃখ পায় বাবার এই আচরণে|দাদি আমাদের সাথেই থাকতো |মা -বাবার ডিভোর্সের পরেই দাদি গ্রামের বাড়িতে চলে যায় | গ্রামের বাড়ি যাওয়ার আগে দাদি মাকে কিছু কথা বলে যায়, কথা হলো, মা জলি, মানুষের সাথে মানুষের বিভিন্ন ধরনের সম্পর্ক হয় | আমাদের পাশের বাসার মানুষকে আমরা খালা বলি,মামা বলি কেন? কারণ আমরা তাদের সাথে একটা সামাজিক সম্পর্ক তৈরী করি,সবাই রক্তের সম্পর্কের হয় না| তার পরেও আমরা তাদের জন্য মায়া অনুভব করি|

আমরা তাদের কষ্টে কষ্ট ও অনুভব করি|মানুষের জীবন গল্প মতো যদি হতো| মা তোমার সাথে আমার ছেলে রফিক যে অন্যায় করেছে তার কোনো প্রতিকার আমার কাছে নাই |ছেলে -মেয়ে বড় হয়ে গেলে তাদের নিজের জগৎ হয় তখন তারা নিজেদের মতো করে চলে সেখানে বাবা -মার কিছু করার থাকে না | শোনো মা,রফিকের বৌ হিসেবে আমি তোমার মা হয়েছিলাম|আজ যদি রফিক আর তোমার মধ্যে সম্পর্কটা না ভেঙ্গে রফিক যদি মরে যেতো,তবে কি হতো? আমি তোমার শাশুড়ী মা’ই থাকতাম|কিন্তু আজ আমার ছেলে রফিক বেঁচে থাকার পরেও আমি তোমার কেউ না মা |

শুনো মা কোনো সম্পর্ক শুধু কাগজ দিয়ে হয় না| একটা সম্পর্ক তৈরী হয় মন দিয়ে | তেমার আর আমার সম্পর্ক হলো মা আর মেয়ের সম্পর্ক | আমাদের মা -মেয়ের সম্পর্ক সারাজীবন ধরেই থকবে| তুমি, আমি আর টুনটুনি আমরা এক আত্মা | তুমি হলে আমার মা |তখন আমার মা দাদিকে বলে,আম্মা আপনি ইচ্ছে করলে আমাদের সাথে থাকতে পারেন| দাদি মার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,না জলি আমি যদি এখানে তোমাদের সাথে থাকি তাহলে কিছু জটিলতার সৃষ্টি হবে, মানুষ নানা ধরনের সমালোচনা করবে এর চেয়ে ভালো আমি গ্রামেই চলে যাই|

রফিক আমার ছেলে সে আমার সাথে যোগাযোগ করবে, আর আমার মাধ্যমে টুনটুনের সাথে যোগাযোগ করবে, এগুলো তোমার সামনে হবে তখন তোমার খারাপ লাগবে |আমার ছেলের অন্যয়ের জন্য এই সাজাটা আমার প্রাপ্য ছিল | আমি যদি এখানে থাকি তাহলে রফিক নিজে তার নতুন সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকবে , সেই সাথে মা আর মেয়ের দায়িত্ব তোমার কাঁধে দিয়ে নিশ্চিতন্তে থাকবে |

আমি যদি তোমার জায়গায় থাকতাম তাহলে আমি বলতাম মেয়েকে নিয়ে যেতে | তারপর আনন্দে কাটাক জীবন | সন্তানের দায়িত্ব মা -বাবার দুজনের | পরের সকালে দাদি গ্রামের বাড়িতে চলে যায় | দাদিকে আমি আর মা ট্রেনে তুলে দিতে যাই| দাদি চলে যাওয়ার কিছুদিন পরে হঠাৎ একদিন রাতে বাবা – মার ফোনে কল দেয়, আমার সাথে কথা বলার জন্য না, আমার সাথে বাবার প্রতি সপ্তাহে তিন দিন কথা হয় | মা বাবার কল আসলেই আমার কাছে মোবাইল দিয়ে দূরে চলে যায়, আর কখনোই জানতে চায় না বাবার সাথে আমার কি কথা হয় | বাবা সব সময়ই কথার একটা পযার্য়ের এসে জানতে চায় টুনটুন তোমার মা কেমন আছে?ঠিক তখনি আমি রেগে যাই আর বলি ভালো,আর রাখি বলে কলটা কেটে দেই| বাবার যখন ফোন আসে মা তখনি আমাকে ডেকে দেয় , আমি রিসিভ করার সাথে সাথে বাবা আমাকে বলে টুনটুন তোমার মাকে মোবাইল টা দাও তো মা, আমি নিজে থেকেই বলি মা কথা বলবে না|

তখন বাবা নরম গলায় বলে টুনটুন জলিকে মোবাইল টা দাও |আমি মার কাছে মোবাইল টা গিয়ে বলি মা, বাবা তোমার সাথে কথা বলতে চাইছে | মা একটা কথাও না বলে মোবাইলটা নিয়ে বাবাকে বলে,রফিক জলি বলছি , আমি পাশেই একটু দূরে দারিয়ে ছিলাম | বাবা কথা মা শুধু শুনছিলো , কিছুই বলছিলো না , একবার একটু বলছিলো হু আমি শুনছি, মার শেষ কথাটা বলে বাবাকে রফিক ঠিক আছে আমি আম্মা কে ফোন দিয়ে বলবো , এই কথটা বলে মা ফোন টা কেটে দেয় | আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম তুমি কেনো বাবার সাথে কথা বললে?

মা হেঁসে বললো টুনটুন শোন, তোর বাবার সাথে আমার রাগ, অভিমান বা অন্য ধরনের আবেগের সম্পর্কটা এখন আর নেই | আমি যদি কলটা রিসিভ না করলে তোমার বাবার মনে হতো আমি এখনো তার জন্য কষ্ট পাই|

এই কথা শুনে আমি দৌড়ে আমার রুমে চলে আসি, আর অনেক কান্না করি| আমি ভাবতাম হয়তো কোনোদিন বাবা এসে মার কাছে মাফ চাবে| তারপর আবার আমরা একসাথে থাকবো| কিন্তু আজ আমি বুঝতে পারছি আমার পরিবার আর কখনো এক হবে না | বাবা আমাদের পরিবারটাকে নিজের হাতে ভেঙ্গে ফেলেছে যা আর কখনো জোড়া লাগবে না |পরের দিন সকালে মা দাদিকে কল দেয় এবং অনেক সময় ধরে কথা বলে, এক সময় মা দাদিকে বলে, আম্মা রফিক আপনাকে নিয়ে টেনশন করে,আপনি নাকি রফিকের কল রিসিভ করেন না? মা দাদিকে আরো বলে,আম্মা আপনি কল রিসিভ না করলে রফিক আবার আমাকে কল করবে আর এটা আমার ভালো লাগবে না | আপনি কল রিসিভ করে কথা বলে ওকে যা বলার বলে দিয়েন|

দাদু প্রতিদিন এক বার করে আমাকে ফোন দিয়ে কথা বলে | মার সাথেও বলে | আগে ছুটির সময় বেরাতে যেতাম নানু বারিতে এখন খুব বেশি যাই না | নানুর বাসায় গেলেই মামা, মামি বাবাকে নিয়ে অনেক আজেবাজে কথা বলে, আর আমার সামনেই মাকে বলে তুই চাকরি করিস তাতে কি ও কি তোর একার মেয়ে? রফিকে বলবি তার মেয়ের সব খরচ পাঠাতে, তোর একটা ভবিষ্যৎ নাই? যদি মেয়ের পিছনেই সব খরচ করিস তোকে কে দেখবে?আর তোর কি এমন বয়স?তুই কি সারাজীবন একাই থাকবি নাকি? নানুর এই কথা শুনে মাকে খুবই রেগে যায়|

আর নানুকে বলে, আম্মা আমার ভুল হয়ছে তোমাদের কাছে আসা, এর চাইতে বাসায়ি থাকা ভালো| তখন নানু চুপ হয়ে যায়| এইসব কথার জন্য নানু বাসায় যেতে ইচ্ছে হয় না |তারপরও মাঝে মাঝে আসি কারণ আমাদের খুব বেশি কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই | মা – বাবার সম্পর্ক ভেঙ্গার পর থেকে সবাই আমাদের থেকে একটু এড়িয়ে চলে| আমি আমার মামি রান্না অনেক পছন্দ করি | ডিসেম্বর মাস আমার পরীক্ষা শেষ| বাসায় একা মন খারাপ করে | আজ খাওয়ার সময় মা আমাকে বললো চল আমরা কোথাও বেড়াতে যাই|,আমি অনেক খুসি হলাম,মা বললো আমি কিছুদিন ছুটি নিয়েছি বলো তো কোথায় যাওয়া যায়,আমি প্ল্যান করছি এই সময় মা বলে উঠলো তোর দাদু বাড়িতে গেলে কেমন হয়? মার কথা শুনে আমি অবাক হলাম |খুশিতে আমি মাকে জরিয়ে ধরি|

পরের দিন আমি আর মাকে দাদা,দাদির জন্য কিছু কেনাকাটা করলাম| তারপরের দিন আমরা দাদু বাড়িতে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হলাম| আমি আর মা যখন দাদু বাড়ির সামনে গিয়ে রিকশা থেকে নামছি তখন গ্রামের এক কাকু আমাদের দেখতে পায় আর সে এসে রিকশা থেকে আমাদের ব্যাগটা নামিয়ে গেইটে ধুমধাম ধাক্কা দিতে লাগলো আর দাদুকে ডাকলে লাগলো বাহির থেকে, বলতে লাগলো চাচা গেইট খুলো তারাতাড়ি| আমি আর মা দারিড়ে আছি কাকার পিছনে| তখন দাদি গেইট খুলে কাকা’কে কিছু বলতে গিয়েই আমাদের দেখলো|

দাদি শুধু আমার দিকে হাত বারিয়ে দিলো আমি দৌড়ে গিয়ে দাদিকে ধরে ফেললাম|আমার মনে হচ্ছে দাদি কাপছে পরে যাবে এখনি|আমার দাদি খুবই শক্ত মনের মানুষ |আজ সেই দাদিও একটু পর পর চোখ মুছছে আর বলে, জলি মা, তুমি আমার মেয়ে না তুমি আসলেই আমার মা | একমাত্র মা’ই বুঝতে পারে সন্তান কি চায়?আজ তুমি আমার সব কষ্ট দূর করে দিলে |আমার জীবনে আর কোনো কষ্ট নাই |আমার মা আমাকে ত্যাগ করে নাই |

3 thoughts on “ভেঙে যাওয়া পরিবারের সন্তানেরা -রক্তের সম্পর্ক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *